নানার বাড়ির জমি নিয়ে বিরোধ: শিবপুরে বসতঘর ভাঙচুরের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক, শিবপুর:
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় নানার বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে একটি বসতঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে উপজেলার সাধার চর ইউনিয়নের সৈয়দের খোলা গ্রামের মৃত হানিছ মিয়ার বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মোঃ জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে শিবপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ও স্থানীয়দের দাবি— জমি হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে ‘মাদক ব্যবসায়ী’র মিথ্যা তকমা দিয়ে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে চার ছেলে ও চার মেয়ে রেখে মারা যান সৈয়দের খোলা গ্রামের হানিছ মিয়া। তাঁর সন্তানেরা হলেন— মৃত গিয়াস উদ্দিন, মোঃ জালাল উদ্দিন, মৃত হেলাল উদ্দিন, মৃত জামাল উদ্দিন, মৃত মোসাম্মদ আমিনা বেগম, ফজিলা খাতুন, মোছাম্মৎ জবেদা খাতুন এবং টুকুনি বেগম। এর মধ্যে হানিছ মিয়ার বড় মেয়ে মৃত আমিনা বেগমের ছেলে মনির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মায়ের অংশের (নানার বাড়ির সম্পত্তির হিস্যা) দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বাদী পক্ষ মোঃ জালাল উদ্দিনের অভিযোগ, তাঁর ভাগিনা মনির হোসেন নানার বাড়ির সম্পদ দখল করার উদ্দেশ্যে এলাকার কিছু লোকজনকে সাথে নিয়ে তাঁদের বসতঘর ভাঙচুর করিয়েছেন।
তবে এলাকাবাসী ও ভিন্ন একটি সূত্র বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। স্থানীয়দের মতে, যে ঘরটি ভাঙার কথা বলা হচ্ছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ছিল এবং সেখানে একসময় এলাকার ছোট ছোট শিশুরা কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করত। সম্প্রতি সেই ঘর ভেঙে জালাল উদ্দিন গংরা নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। জালাল উদ্দিন ও তাঁর ভাইয়েরা দীর্ঘদিন ধরে বোন বা ভাগিনাদের প্রাপ্য সম্পত্তি বুঝিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে হুমকি-ডমকি দিয়ে আসছিলেন। কোনো সুরাহা না পেয়ে ও নিরাপত্তার অভাবে ভাগিনা মনির হোসেন তাঁর প্রাপ্য অংশের সম্পত্তি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল মেম্বার এবং সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত তারেক নামের এক ব্যক্তির কাছে বায়না পত্র (দলিল) মূলে বিক্রি করে দেন।
পরবর্তীতে বাবুল মেম্বার ও তারেক ওই সম্পত্তিতে গেলে জালাল উদ্দিন গংরা ক্ষিপ্ত হন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘটনাটি ভিন্ন খাতে মোড় নিতে জালাল উদ্দিন গংরা সাংবাদিকদের ডেকে এনে প্রবীণ বাবুল মেম্বার ও সমাজসেবক তারেককে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ ও ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে গণমাধ্যমে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
মিথ্যা অপবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অভিযুক্ত তারেক বলেন, “আমি একজন সমাজসেবক। আমার বিরুদ্ধে যদি দেশের কোনো থানায় মাদকের বা অন্য কোনো মামলা থাকে, তবে আমি স্বেচ্ছায় যেকোনো শাস্তি মেনে নেব। অন্যথায় আমাকে কেন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী বানানো হচ্ছে? আমি এর তীব্র প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকৃতপক্ষে যারা মাদক বিক্রি করে আর যারা সেবন করে, তাদেরকে ধরার জন্য আমি প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। আমি আমার এলাকাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমার বিরুদ্ধে যারা এই মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছেন, তাদেরকে অতি বিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে জনগণের সেবক হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।”
এলাকাবাসীও জানান, সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল মেম্বার একজন প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তি, যিনি সর্বদা মানুষের কল্যাণে কাজ করেন। তারেকও এলাকায় একজন ভালো ছেলে ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচিত।
এ বিষয়ে সাধার চর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোরশেদ আহমেদ বলেন, “আমার জানা মতে তারেক ভালো ছেলে এবং এলাকায় সমাজসেবক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। যতটুকু শুনেছি, তারেক ঘরবাড়ি ভাঙতে যায়নি। সে সম্পত্তিটি ক্রয় করেছিল বিধায় সেখানে গিয়েছিল। কিছু মানুষ ব্যক্তিগত আক্রোশবশত তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে। তবে সে যদি সত্যিই মাদকের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। আমার ইউনিয়নে মাদকের কোনো স্থান নেই, মাদক নির্মূলে আমি বদ্ধপরিকর।”
ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা শিবপুর মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মামুন মুঠোফোনে জানান, “মনির নামে এক ব্যক্তি নানার বাড়ির সম্পত্তি পাওয়ার জন্য অনেক বছর ধরে ঘুরছিলেন। কোনো সুরাহা না পেয়ে তিনি বাবুল মেম্বার ও তারেকের কাছে জমিটি বায়না করেন। মনির ইতিপূর্বে বারবার আমার কাছেও এসেছিলেন। পরবর্তীতে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর উভয় পক্ষকে থানায় আসার অনুরোধ করেছিলাম। তবে জালাল উদ্দিন এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।”
শিবপুর মডেল থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঠিক সত্যতা নিশ্চিত করে পরবর্তী আইনানুগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






