নরসিংদীতে মাদকের অভয়ারণ্য ‘পাট্টা’ স্পট: অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিক্ষার্থীদের ভিড়, নেপথ্যে ‘বরফ কলের রাব্বি
নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী:
নরসিংদী জেলাকে মাদকযুক্ত করার সরকারি ও সামাজিক প্রচেষ্টার মুখে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরের ঐতিহ্যবাহী ‘পাট্টা’ নামক একটি মাদকের স্পট। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নরসিংদী থেকে মাদক উচ্ছেদ করতে হলে সর্বপ্রথম এই স্পটটির অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে এই স্পটটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল মাদকের রাজত্ব, যা ক্রমান্বয়ে গ্রাস করছে স্থানীয় তরুণ প্রজন্মকে।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই স্পটটিতে বর্তমানে স্কুল-কলেজের উঠতি বয়সী তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আনাগোনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এমনকি তরুণী ও নারীদেরও নিয়মিত এখানে ‘বাংলা মদ’ (যা স্থানীয়ভাবে ‘মাম’ নামে পরিচিত) সংগ্রহ করতে আসতে দেখা যায়।
কে এই রাব্বি?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই স্পটটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও রাজত্ব এখন ‘রাব্বি’ নামের এক যুবকের হাতে। স্থানীয়রা জানান, রাব্বি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকা অবস্থায় একটি বরফ কলে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ বছর সেখানে কাজ করার পর একপর্যায়ে ‘ফুড ফর মাস’ (Food for Mass) প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হন। অথচ আজ তিনি নিজেকে এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্যের অঘোষিত মালিক হিসেবে দাবি করছেন।
নেতাদের নাম ভাঙানো ও প্রশাসন ম্যানেজের দাবি:
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, রাব্বির এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। কেউ প্রতিবাদ করলে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিএনপির বড় বড় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে চলেন। তিনি বুক ফুলিয়ে দাবি করেন, “এই স্পট বিএনপি নেতারা চালায় এবং প্রশাসন ম্যানেজ করেই আমরা এই মদের বার চালাচ্ছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিজের অবস্থান পাকা করতে রাব্বি স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়মিত মাসিক মাসোহারা (টাকা) এবং ফ্রিতে মদ সরবরাহ করে থাকেন, যার ফলে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমেও সহজে খবর আসে না।
লাইসেন্সের তোয়াক্কা নেই, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব:
আইন অনুযায়ী, সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত মদের বার থেকে কেবল লাইসেন্সধারী ব্যক্তিরাই নির্দিষ্ট পরিমাপে মদ ক্রয় করতে পারেন। সাধারণ মানুষের কাছে বা লাইসেন্স ছাড়া মদ বিক্রি করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই স্পট থেকে বিগত দিনে ‘টনে টন’ বাংলা মদ অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এর ফলে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
ভেজাল মদ ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ:
সাধারণ ক্রেতা ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে এখানে চার কোয়ালিটির মদ বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি মদেও ব্যাপক ভেজাল মেশানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আগের মতো আসল মদ এখন পাওয়া যায় না। অথচ দাম রাখা হচ্ছে চড়া—প্রতি লিটার মদের দাম রাখা হচ্ছে ১৫০০ টাকা। এ বিষয়ে স্পট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা দায়সারাভাবে জানান, “সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাই মদের দামও বেড়েছে, এখানে আমাদের কিছু করার নেই।”
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ:
নরসিংদীর সচেতন নাগরিক সমাজ, অভিভাবক এবং সাধারণ জনগণ এই মাদক স্পটের কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি রোধে অতি বিলম্বে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অনতিবিলম্বে এই স্পটে সঠিক তদন্ত পরিচালনা করে মূল হোতা রাব্বিসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।






