মৃত্যুর আগেই মৃত্যু সনদ! তোপের মুখে নরসিংদী পৌরসভার সচিব মাহফুজুর
নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী
ঢাকা, ২৭ মে, ২০২৬
দেশের অন্যতম প্রথম শ্রেণির পৌরসভা নরসিংদীতে নাগরিক সেবার চরম বিপর্যয় ও প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে ‘মৃত্যু সনদ’ দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে পৌরসভার দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সচিব মাহফুজুর রহমানকে।
এদিকে ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নোংরা পরিবেশের কারণে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ পৌরবাসী এখন প্রশাসনের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ঘটনার সূত্রপাত: জীবিত ব্যক্তিই যখন ‘মৃত’
আদালতের নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বকুল চন্দ্র বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি একটি হলফনামার (Affidavit) মাধ্যমে দাবি করেন যে, তার পিতা হরিদাস চন্দ্র বিশ্বাস ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন। কোনো প্রকার মাঠপর্যায়ের তদন্ত বা তথ্য যাচাই ছাড়াই নরসিংদী পৌরসভা হরিদাস চন্দ্রের নামে একটি মৃত্যু সনদ ইস্যু করে।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে, গত ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নরসিংদী পৌরসভার (স্মারক নম্বর: নপৌস/স্বাস্থ্য-১২/২০২৬/৭৯) পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য উল্টো আদালতের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন পাঠান।
আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ ও তলব
পৌরসভার এমন অদ্ভুত আবেদন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেশকাতুল ইসলামের আদালতে উপস্থাপিত হলে বিজ্ঞ আদালত তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানান:
”হলফনামার বিষয়বস্তুর সত্যতা যাচাই করা আদালতের কাজ নয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০০৪ অনুযায়ী, যেকোনো তথ্যের সঠিকতা যাচাই-বাছাই করার আইনি দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের (পৌরসভা)।”
কর্তব্যে অবহেলার কারণে আদালত নরসিংদী পৌরসভাকে সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। একই সাথে, গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে পৌর সচিব মাহফুজুর রহমানকে সশরীরে লিখিত ব্যাখ্যাসহ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল।
এক দশকে গড়ে তুলেছেন ‘প্রভাবশালী বলয়’
পৌরবাসীর অভিযোগ, সচিব মাহফুজুর রহমান প্রায় এক দশক ধরে একই কর্মস্থলে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় থাকার সুবাদে তিনি পৌরসভায় একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। অফিস চলাকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আড্ডা, তোষামোদ এবং প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে তার বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়সম অভিযোগ। যথাযথ যাচাই ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু সনদ ইস্যু করার কারণে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ বড় ধরনের আইনি ও পারিবারিক জটিলতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দায় এড়ালেন সচিব, তদন্তের আশ্বাস প্রশাসকের
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার বিতর্কিত সচিব মাহফুজুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া আমি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে পারব না।”
তবে বিষয়টি নিয়ে নরসিংদী পৌর প্রশাসক ও জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব নাদিরা আখতার আশ্বস্ত করে বলেন, “বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে।”
পৌরবাসীর দাবি
নরসিংদী পৌরসভার সাধারণ জনগণের দাবি, অবিলম্বে এই মৃত্যু সনদ কেলেঙ্কারি ও পৌরসভার অভ্যন্তরে চলমান সকল অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় এনে প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় নাগরিক সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।






