নরসিংদীতে ভেজাল মসলার রমরমা ব্যবসা: জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
মোস্তাক আহমেদ নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী
আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে নরসিংদীর বড় বাজারে সিন্ডিকেট করে অবাধে চলছে বিষাক্ত ও ভেজাল মসলার রমরমা ব্যবসা। গুঁড়ো হলুদ, মরিচ ও ধনিয়ার নামে বিক্রি হচ্ছে চালের গুঁড়া, কাঠের ভুষি এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর টেক্সটাইল রং ও কংক্রিটের গুঁড়া। নরসিংদীর এই ভেজাল মসলার একটি বড় চালান কৌশলে সরবরাহ করা হচ্ছে সিলেটের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চক্রের কারণে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে সততার সাথে ব্যবসা করা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে থলের বিড়াল: শাহজাহান এন্টারপ্রাইজের কারসাজি
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভেজাল মসলা সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা নরসিংদী বড় বাজারের ‘শাহজাহান এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী শাহজাহান এবং তার ছেলে সিয়াম। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। অধিক মুনাফার আশায় তারা মসলার ওয়ান বাড়াতে এবং আকর্ষণীয় রঙ করতে মেশাচ্ছেন ক্ষতিকর উপাদান।
বড় বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
”এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে আজ আমাদের পুরো বাজারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। আমাদের ব্যবসার অধঃপতন ঘটছে। আমরা চাই অতি দ্রুত প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসে এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিক।”
শূন্য থেকে কোটিপতি: পেছনের গল্প
সরেজমিনে জানা যায়, শাহজাহানের আদি জন্মস্থান ভৈরব এলাকায় হলেও বর্তমানে তিনি নরসিংদী পৌর শহরের বেপারী পাড়ায় বসবাস করছেন। একসময় নরসিংদীতে এসে অন্যের মসলা ভাঙানোর মিলে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন শাহজাহান। সেখান থেকেই রপ্ত করেন মানুষকে ঠকিয়ে মসলায় ভেজাল দেওয়ার কৌশল।
পরবর্তীতে এই ভেজাল ব্যবসার ওপর ভর করেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো বদলে যায় তার ভাগ্য। সাধারণ মানুষকে বিষ খাইয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বর্তমানে নরসিংদীতে তার নিজস্ব বাড়ি ছাড়াও রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী দুটি বিলাসবহুল বাস। এখানেই শেষ নয়, সিলেটের জৈন্তাপুর বাজারেও তার একাধিক ফ্ল্যাট এবং দোকানের পজিশন (বিট) রয়েছে বলে জানা গেছে।
নরসিংদীর ভেজাল মসলা যাচ্ছে সিলেটে
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শাহজাহান এন্টারপ্রাইজের মূল টার্গেট সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চল। নরসিংদীতে তৈরি করা এই বিষাক্ত হলুদ ও মরিচের গুঁড়ো চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে সিলেটের বাজারে।
সিলেটের কয়েকজন ভুক্তভোগী ক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নরসিংদী থেকে আসা এসব আকর্ষণীয় রঙের মসলা কিনে তারা প্রতারিত হচ্ছেন। রান্না করার পর মসলার আসল রূপ ও গন্ধ পাওয়া যায় না, বরং তা খেয়ে অনেকেই পেটের পীড়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
ভোক্তা অধিকার ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা
খাদ্যে এমন ভয়াবহ ভেজালের মহোৎসব চলায় চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছেন, এই ভেজাল মসলা নীরব ঘাতকের মতো মানুষের লিভার, কিডনি নষ্ট করাসহ ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করছে।
এই অসাধু সিন্ডিকেটকে গুঁড়িয়ে দিতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সাধারণ ব্যবসায়ীরা।






